Health

পিত্ত পাথুরি অসুখ ও আধুনিক চিকিৎসা

পিত্ত পাথুরি অসুখ বর্তমান সময়ে একটি অতি পরিচিত সমস্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই রোগ নির্নয় ও চিকিতসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। গত তিন দশকের মধ্যে, বিশেষ করে রোগ নির্নয়ে আলট্রাসনোগ্রাফীর ব্যবহার পিত্ত পাথুরি শনাক্তকরনকে অতীব সহজ করে দিয়েছে।

পিত্ত পাথুরি অসুখ ও আধুনিক চিকিৎসা
পিত্ত পাথুরি অসুখ ও আধুনিক চিকিৎসা

পিত্ত পাথুরি অসুখ কি 

পিত্তথলি বা পিত্তনালির মধ্যে পাথর তৈরি হওয়া কিম্বা পাথরের উপস্থিতি এবং তৎসংগে কিছু উপসর্গের সম্মিলিত অবস্থাকেই পিত্ত পাথুরি অসুখ বলা হয়। কোনো রকম উপসর্গ ছাড়া কিম্বা তীব্র পেটে ব্যথা নিয়ে পিত্ত পাথুরির রোগী হাসপাতালে আস্তে পারেন।শরীরে বেশ কিছু অঙ্গে পাথুরি অসুখ হয়ে থাকে। তার মধ্যে পিত্ত পাথুরি অসুখ অন্যতম।

কারা পিত্ত পাথুরি অসুখে আক্রান্ত হন

এক সময় এমন কথা চালু ছিল যে, চল্লিশ কিম্বা চল্লিশোধর্ধ বয়সের ফর্সা, স্থুলকায় মহিলা, যিনি কয়েক সন্তানের মা- এমন মহিলারাই সাধারণত পিত্ত পাথুরির অসুখে ভূগে থাকেন। বর্তমানে এ কথার এ কথার বাস্তবতা খুব একটা নেই। তবে এটা ঠিক যে, মহিলাদের মদ্ধেই এ রোগের পাদুর্ভাব বেশি। এখন প্রচুর যুবক বয়সের পুরুষ এবং মহিলাদের মধ্যে পিত্ত পাথুরির সমস্যা দেখা যাচ্ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রোগের পাদুর্ভাব বাড়তে থাকে। এক সময় মূলত পাশ্চাত্যের অসুখ মনে করা হলেও বর্তমানে বিশ্বজুড়েই এ রোগ বেড়ে গেছে। বিশ্বায়নে প্রভাব ও খাদ্যভ্যাসের পরিবর্তন সম্ভবত এর কারনণ। আবার শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও পিত্ত পিত্তপাথুরি অসুখ দেখা যায়। তবে এক্ষেত্রে পিত্তথলির জন্মগত ত্রুটি কিম্বা লোহিতকণিকা ভেংঙ্গে যাওয়ার কারনে জন্ডিস পাথর সৃস্টি হওয়ার জন্য দ্বায়ী থাকে।

পিত্ত পাথুরি অসুখের কারণ কি 

পিত্ত পাথরের সব উপাদান পিত্তের মধ্যেই বিদ্যমান। এর অন্যতম উপাদান কোলেস্টেরল, যাকে পিত্তের মধ্যে দ্রবীভূত করে রাখে পিত্ত লবন। স্বাভাবিক অবস্থায় এই দুইয়ের আনুপাতিক হার একটা নির্দিস্ট সীমার মধ্যে থাকে। কোন কারনে কোলেস্টেরল এর পরিমান বেড়ে গেলে কিম্বা পিত্ত লবনের পরিমান কমে গেলে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল দ্রবীভূত অবস্থা থেকে বেড়িয়ে দানা বাঁধে এবং পাথরে পরিনত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ক্যালসিয়াম, ফসফেট ও বিলিরুবিন। অনেক সময় পিত্তথলিতে সংক্রমণ হয়ে ব্যাকটেরিয়া ও পিত্তথলির আন্ত-আবরনীর স্খলিত কোষ একত্রিত হয়ে দানাদার কণার সৃষ্টি হয়, যাকে কেন্দ্র করে কোলেস্টেরল জমতে থাকে এবং এভাবে ধীরে ধীরে পাথরের সৃষ্টি হয়।

তাছাড়া দীর্ঘসময় পিত্তথলিতে পিত্ত জমা থাকলে কিম্বা অন্ত্রের মধ্যে পিত্ত নিঃসরণ শ্লথ হলে, যেমনটা গর্ভাবস্থায় হয়ে থাকে, তখন পাথর সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশে তইরি হয়। সম্ভবত এই কারণটি মহিলাদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। যদিও কোলেস্টেরল পিত্ত পাথরের অন্যতম উপাদান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমান স্বাভাবিক থাকে। তবে প্রায়শই দেখাযায়, যকৃতের মধ্যে চর্বির আধিক্য ও দীর্ঘমেয়াদি যকৃতের প্রদাহ রোগীদের পিত্তের উপাদানের পরিবর্তনের কারনে পিত্ত পাথুরি অসুখ হয়ে থাকে।

পিত্ত পাথুরি অসুখের উপসর্গ 

অনেকের ক্ষেত্রে আপাত কোনো উপসর্গ নাও দেখা যেতে পারে। যে কোন কারণে পেটের আলট্রাসনোগ্রাফীর সময় পিত্ত পাথর ধরা পরে। অনেক রোগী ক্ষুদামান্দ্য, অল্প খাবারের পর পেট ভর্তি হয়ে যাওয়ার অনুভূতি, অল্প খাবারের পর পেট ভর্তি হয়ে যাওয়ার অনুভূতি,পেটে অতিরিক্ত গ্যাসের জন্য অস্বস্তি ইত্যাদি উপসর্গের অভিযোগ করেন। তবে এসব উপসর্গের জন্য পিত্তথলিকে একক ভাবে দ্বায়ী করা ঠিক নয়। হঠাৎ করে মাঝাড়ি থেকে তীব্রপেট ব্যথা, বিশেষ করে ঊপর পেটের ডান দিকে ব্যথা ও তৎসঙ্গে বমি কিম্বা বমিভাব এবং অসুস্থ বোধ করা পিত্ত পাথুরির জন্য হয়ে থাকে। এই ব্যথা কয়েক ধন্টা থেকে কয়েক দিন পর্জন্ত স্থায়ী হতে পারে।

কয়েক ঘন্টা পর হটাৎ ব্যথা চলে গেলে তাকে স্বল্প মেয়াদী  এ অবস্থাকে বলা হয় স্বল্পমেয়াদী তিব্র পিত্তবেদনা। পত্ত পাথর পিত্তথলির বহির্গমন পথে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে পিত্তথলি সেটাকে স্থানচ্যুত করার জন্য যে চাপ সৃষ্টি করে সেটি প্রতিফলিত হয় তীব্র ব্যথা হিসাবে। পাথর স্থানচ্যুত হয়ে বহির্গমন খোলাসা হলে  তাৎক্ষনিক ব্যথা চলে যায়। পাথর স্থানচ্যুত না হয়ে স্থায়ীভাবে আটকে গেলে পিত্তথলি ফুলে যায়। পীড়িত পিত্তথলিতে সংক্রমণ ঘটে প্রদাহ সৃষ্টি করে। একে বলা হয় আকস্মিক পিত্তপ্রদাহ। এক্ষেত্রে তীব্র ব্যথা পরিবর্তিত হয়ে মাঝাড়ি রকমের স্থায়ী ব্যথার রুপ নেয়। এ অবস্থায় রোগীর পেট পরীক্ষা করে ডান দিকে উপর পেটের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি ও মাংসপেশির দৃঢ়তা পরিলক্ষিত হয়। কয়েক দফায় এ রকম উপসর্গ হলে দীর্ঘমেয়াদি পিত্তথলির প্রদাহ সৃষ্টি  হয়। এ সময় জ্বর, বমি কিম্বা বমিভাব এবং হাল্কা জন্ডিস দেখা দিতে পারে।

পিত্ত পাথুরি  অসুখের জটিলতা

সল্পমেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি -উভয় রকমের জটিলতা হতে পারে। অ্যাকিউট কোলেসিস্টাইটিস আক্রান্ত হলে কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ ও প্রদাহ মারাত্মক আকার ধারন কএ যে রোগী গুরুতর সসুস্থ হয়ে পরেন। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিবায়োটিক এ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের বেলায় এই সংক্রমণ বেশি। এক্ষেত্রে পিত্তথলির ভিতরে পুঁজ সৃষ্টি হয়। এমন কি পিত্তথলিতে পচন ধরতে পারে। পিত্তনালিতে পাথর থাকলে পিত্ত নিঃসরনে বাধার কারণে প্রতিবন্দক জন্ডিস এবং পিত্তনালির প্রদাহ হয়ে থাকে। পিত্তন্সলির পাথর পিত্তনালি ও অগ্ন্যাশয়ের তীব্র প্রদাহের মত জটিল অসুখের সৃষ্টি হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্র অগ্ন্যাশয়ের তীব্র প্রদাহ নিয়ে পিত্তপাথরের রোগী প্রথমবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসেন- জা একটি মারাত্মক ব্যাধি।

দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা সূমুহের মধ্যে অন্যতম হলো পিত্তথলির ক্যানসার। অর্থাৎ দীর্ঘদিন পিত্তথলিতে পাথরের উপস্থিতি পিত্তথলির মধ্যে ক্রমান্বয়ে কিছু পরিবর্তন আনে জা এক সময় ক্যানসারে রুপ নেয়।

রোগ নির্ণয়

আধুনিক মেডিকেল ইমেজিং বিশেষত আলট্রাসনোগ্রাফী পিত্ত পাথুরি সনাক্তকরনের অত্যান্ত সময়োপযোগী পরীক্ষা। পিত্ত পাথুরি সমস্যা সন্দেহ হলেই পেটের আলট্রাসনোগ্রাফী করা অত্যান্ত যৌক্তিক। পিত্ত পাথুরি রোগ নির্ণয়ে আলট্রাসনোগ্রাফী সিটি স্ক্যান কিম্বা এমারআইয়ের চেয়ে ওনেক সময় শ্রেয় বলে বিবেচিত।

চিকিৎসা

নিশ্চিতভাবে পিত্ত পাথুরি অসুখ নির্ণিত হলে সর্বজনস্বীকৃত চিকিৎসা হল, সার্জারী, সার্জারীর মাশমে পিত্তথলির পাথর অপসারণ। বিবেচ্য বিষয় হলো কখন ও কি পদ্ধতিতে পাথরসহ পিত্তথলির অপসারণ করা শ্রেয়। সাধারণত একিউট কোলেসিস্টাইটিস হলে জরূরি অবস্থায় ওষুধ প্রয়োগে চিকিৎসা হয় এবং শতকরা ৯৫ জনের ও বেশিীরে ওঠেন। ৪-৬ সপ্তাহ পর আধুনিক ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতিতে সহজেই পিত্তথলির অপসারণ করা যায়। ওষুধ চিকিতসায় উন্নতি না হলে কিম্বা অপরে উল্লেক্ষিত জটিলতা দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপাচার করতে হয়। শল্যবিদ অভিজ্ঞ হলে এক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতিতে অস্ত্রোপাচার সম্ভভ। তবে রোগী গুরুতর অসুস্থ হলে এক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতিতে পেট কেটে অপারেশন করা ভালো।

বর্তমানে জটিলতা বিহীন রোগীদের ক্ষেত্রে আধুনিক ল্যাপারোস্কপিক কোলেসিসটেক্টমি বিশ্বজুরে স্বীকৃত পদ্ধতি। এতে পেট কাটার জটিলতা নেই। কয়েকটি ছোট ছিদ্র করে তার একটির মধ্যে দিয়ে টেলিস্কোপ ঢুকিয়ে সংজুক্ত সিসিডি ক্যামেরার মাধ্যমে টেলিভিশনের পর্দায় ছবি দেখে অন্ন ছিদ্রপথে বিশেষ ধরনের পাথরসহ পিত্তথলি অপসারন করা হয়। একজন দক্ষ শল্যবিদ মূল অপারেশন পর্ব ২০-২৫ মিনিটে সমাধা করতে পারেন।

যেহেতু পেটের কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করা হয়না এবং বাইরের পরিবেশে উন্মুক্ত করা হয়না তাই অস্ত্রোপাচারের ৩ ঘন্টা পরেই রোগীকে মুখে খাবার দেয়া যায় এবং ছিদ্রগুলোতে বাহ্যিককোনো সেলাই দিতে হয় না। ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতিতে সকালে অস্ত্রোপাচার করার পর বিকেলেই একজন রোগী হাসপাতাল ত্যাগ করতে পারেন এবং কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরতে পারেন। যদি একই সঙ্গে পিত্তথলি এবং পিত্তনালিতে পাথর থেকে তাহলে পেট না কেটে এই পদ্ধতিতে অস্ত্রোপাচার করা সম্ভব।

উপসর্গবিহীন পিত্তপাথুরির জন্য করণীয়

অপ্রাসঙ্গিকভাবে নির্ণিত পিত্ত পাথুরি যা উপসর্গবিহীন তার ক্ষেত্রে কি করনীয় তা নিয়ে অনেকে পরামর্শ চেয়ে থাকেন। কেবল অতীব বৃদ্ধ,বার্ধক্যজনিত সমসসায় আক্রান্ত এবং বেহুশ অ অস্ত্রোপাচার করা ঝুকিপূর্ণ -এরুপক্ষেত্রে অস্ত্রোপাচার না করাই ভালো কিন্তু পিত থলিতে ছোট ছোট অনেক পাথর , ৪০ বছরের কম বয়স, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত-এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে পিত্তথলির পাথর অসসারন অবশ্যই জরুরী। কেননা, এধরনের ব্যক্তিদের পিত্তথলির পাথরে ভোগার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।

সন্তান ধারনে সক্ষম মহিলাদের, বিশেষত যারা পরবর্তি সন্তান গ্রহনে আগ্রহী তাদের অবশ্যই পরবর্তী গর্ভধারনে র আগেই  অস্ত্রোপাচার করে পিত্তথলির পাথর অপসারণ করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। না হলে গর্ভকালে সমস্যা হওয়াই স্বাভাবিক, জা মা কিম্বা গর্ভজাত সন্তান উভয়ের জন্নই হুমকি হিসাবে দেখা দিতে পারে।

গর্ভকালীন পিত্ত পাথুরি সম্পর্কিত সমস্যা

গর্ভধারনকালীন উপসর্গ প্রণয়নকারী পিত্ত পাথুরি কিম্বা গর্ভাবস্থায় পর্জবেক্ষনের সময় নির্ণিত পিত্ত পাথুরি অনেকসময় রোগী এবং চিকিতসক উভয়কে চিন্তিত করে ফেলে। গর্ভাকালে পিত্ত পাথুরির প্রদাহ দেখা দিলে অবশ্যই ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে হবে। তবে এমন ওষুধ বেছে নিতে হবে যা গর্ভজাত শিশুর কোন ক্ষতি না করে। গর্ভাবস্থায় ২০ সপ্তাহের মধ্যে হলে ল্যাপারোস্কপিক কোলেসিসটেক্টমির করাই শ্রেয়। প্রথম ৮-১২ সপ্তাহের মধ্যে চিহ্নিত হলে এবং অস্ত্রোপাচার করা নিরাপদ। ২অ সপ্তাহের পরে চিহ্নিত হলে উপসর্গনাথাক্লে পর্জবেক্ষন অ তেলজাতীয় খাবার পরিহার করা উত্তম। কিন্তু ২০ সপ্তাহের পর উপসর্গ সৃষ্টিকারী পিত্ত পাথর ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত না হলে সনাতন পদ্ধতিতে পেট কেটে অস্ত্রোপাচার করা নিরাপদ। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে গর্ভপাত বিম্বা জরায়ুর মধ্যে বাচ্চা মারা যেতে পারে।

লিভার রোগীদের যে সকল খাবার খাওয়া প্রয়োজন

উপসংহার

পিত্ত পাথুরির আধুনিক চিকিৎসা যেহেতু সহজ অ নিরাপদ তাই এই সমস্যা চিহ্নিত হলে বিশেষ ক্ষেত্র ছড়া আধুনিক যন্ত্রের মাদ্ধমে পিত্তথলির অপসারণ সুভিধাজনক সময়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শল্যবিদ এবং ভালো হাসপাতালে করে নেয়াই যুক্তিসঙ্গত ও বুদ্ধিমানের কাজ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button